আল আকসা মসজিদের ইতিকথা | ইহুদী এবং খৃস্টানদের বিশ্বাস ও চিন্তার আলোকে পবিত্র স্থান ও হাইকাল (আল-আকসা-১২)

আল আকসা মসজিদের ইতিকথা শীর্ষক এই প্রবন্ধগুলো এ এন এম সিরাজুল ইসলামের লেখা “আল আকসা মসজিদের ইতিকথা” গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। সুন্দর তথ্যবহুল এই গ্রন্থটি বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত।

ইহুদী চিন্তার আলোকে পবিত্র স্থান ও হাইকাল


ইহুদীরা হাইকালে মুসলিম উত্তরাধিকার স্বীকার করে না। তারা হাইকালকে ইহুদী ধর্মের আলোকে পুনঃ নির্মাণ করতে চায়। তাদের ধারণা ইসলামের পূর্বে হাইকালকে ২ বার ভাঙ্গা হয়েছে। তাই এখন তাদের ৩য় হাইকাল নির্মাণ করতে হবে। তাদের আরো ধারণা, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের হাতে পড়ে হাইকালের বহু বিকৃতি ঘটেছে, সে বিকৃতি দূর করা প্রয়োজন ।
বিন গুরিয়ন ও মানাচেম বেগিন বলেছেন, 'জেরুসালেম ছাড়া ইসরাইলের কোন মূল্য নেই এবং হাইকাল ছাড়া জেরুসালেমের কোন অর্থ নেই।' এটা এখন ইসরাইলের জাতীয় শ্লোগান হিসেবে পরিণত হয়েছে। বর্তমান যুগের ইহুদীরা ইসরাইলের জাতীয় পতাকায় হাইকালকে ছয় তারকা বিশিষ্ট প্রতিকের মর্যাদা দিয়েছে। এটা তাদের কাছে দাউদ তারকা নামে পরিচিত। ইসরাইলী পতাকার মাঝখানে ঐ প্রতীক অবস্থান করছে। তাদের গাড়ী, বিমান ট্যাংক ও ক্ষেপনাস্ত্রের মধ্যে ঐ প্রতীক বিরাজ করছে। তাদের মতে হযরত দাউদ (আঃ) হচ্ছেন ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা। অথচ তারা এর আগে ইয়াকুবকে (আঃ) ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বলেছিল । ইসরাইলের লিখিত কোন সংবিধান নেই। তাদের সর্বোচ্চ সংবিধান হচ্ছে তাওরাত। এই দৃষ্টিতে তাদের রাষ্ট্রটি হচ্ছে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র। আরো বেশি আরব মুসলিম রাষ্ট্র গ্রাস করার লক্ষ্যে তারা এখন পর্যন্ত ইসরাইল রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সীমানা ঘোষণা করেনি। তারা তাওরাতের বর্ণিত বৃহত্তর ভূ-খণ্ডকেই নিজেদের রাষ্ট্রের সীমানা মনে করে। ইহুদীরা তাদের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই কথা বলছে। যদিও তাদের মধ্যে উন্নত চারিত্রিক গুণ নেই। বাতিল ও বিকৃত ধর্মে সেরূপ চারিত্রিক গুণাবলী কিভাবে আসতে পারে? এখন আমরা হাইকাল সম্পর্কে ইহুদীদের অতীত ও বর্তমান চিন্তার উৎসসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করবো।

তাওরাতে হাইকাল

তাওরাতের ১ম অধ্যায়ে সৃষ্টি পর্যায়ে, আল্লাহর ওয়াদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাতে ইবরাহীমকে (আঃ) বলেছেন, 'আমি তোমার বংশধরকে এই যমীন দান করবো'। অথচ ইহুদীরা ভুলে গেছে, ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশের ইসমাঈল শাখাও রয়েছে। তাই বনি ইসমাঈল আল্লাহর ঐ ওয়াদার অংশীদার। মুসলমান হচ্ছে ইসমাঈলের (আঃ) বংশধর। তাওরাত ইয়কুব (আঃ) সম্পর্কে বলছে, 'তুমি বাইতে ইলে যাও এবং সেখান বাস কর। সেখানে তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে একটি জবেহর স্থান তৈরি কর।' বাইতে ইল বলতে বাইতুল মাকদিসকে বুঝানো হয়েছে । ইউসুফ (আঃ) সম্পর্কে তাওরাতের বক্তব্য হল, ইউসুফ (আঃ)-এর হাড়গোড় মিসর থেকে জেরুসালেমে নিয়ে আসা হয়েছে। তাওরাত মূসা (আঃ) সম্পর্কে বলে: মূসা (আঃ) ফেরাউনকে বলেছেন, আমার জাতিকে ছেড়ে দাও। ফেরাউন বলেছে, আমি তাদেরকে ছাড়বো না। হযরত মূসার (আঃ) উদ্দেশ্য ছিল, বনি ইসরাইল জেরুসালেমের পবিত্র স্থানে এসে ইবাদাত করবে।

তাওরাত মূসা (আঃ)-এর পরবর্তী নবী ইউশা বিন নূনের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছে, আল্লাহ তাঁকে জেরুসালেমের দেয়াল ডিঙ্গিয়ে ভিতরে প্রবেশের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তীহ ময়দানে অবস্থানরত ইহুদীদেরকে নিয়ে অভিযানের হুকুম দেন ।

এইভাবে তাওরাত বনি ইসরাইলের নবীদের সাথে জেরুসালেম নগরীর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছে। তারপর হযরত দাউদ এবং সুলাইমান (আঃ) এর সোনালী যুগ নিয়েও আলোচনা করেছে। জেরুসালেমের পবিত্র স্থান সম্পর্কে ইহুদীরা তাওরাত থেকে যে রকম প্রেরণা পায়, ঠিক সে ধরনের প্রেরণা খৃস্টানদের মাঝেও রয়েছে। কেননা ইহুদীদের মত তাওরাত এবং ইঞ্জিল তাদেরও পবিত্র কিতাব।

তালমুদে হাইকাল

তালমুদ হচ্ছে তাওরাতের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। এটি ২০ খণ্ডে বিভক্ত বিরাট বই। তাই এটিও ইহুদীদের কাছে পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ এবং ক্ষেত্র বিশেষে তা তাওরাত থেকেও বেশি পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। হাখামাত ইহুদীরা ৪শ' থেকে ৬শ' খৃস্টাব্দে এই গোপন কিতাবটি রচনা করে। এই কিতাব ইহুদীদের চিন্তা পরিকল্পনার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এটি তাওরাতের ব্যাখ্যা হওয়ার কারণে তাতে পবিত্র স্থান এবং হাইকাল সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা স্থান পেয়েছে। তালমুদে বহু ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তবে তাতে সর্বদাই অতিরিক্ত বক্তব্য রয়েছে এবং আলোচনায় বাড়াবাড়ি করা হয়েছে। মূল তাওরাত বিকৃত হওয়ার কারণে তার ব্যাখ্যা অবিকৃত হওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। তালমুদ বলেছে, ফিলিস্তিনের মাটি পবিত্র। বনি ইসরাইলের নেককার লোকদের সেখানেই দাফন করা উচিত। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে, কাফনের সাথে সেখানকার কিছু মাটি দেয়া উচিত। 

হাইকাল এবং ইহুদী পণ্ডিতদের তৈরি প্রটোকল

ইহুদীদের এই প্রটোকলটি এমন একটি বই যা বিশ্ব ইহুদী রাষ্ট্রের কল্পিত সীমানা অংকন করেছে। এই বই অনুযায়ী জেরুসালেম থেকে হযরত দাউদ (আঃ)-এর বংশধরগণ, গোটা বিশ্ব শাসন করবে। ১৮৯৭ খৃঃ সুইজারল্যান্ডের বেল শহরে আধুনিক যায়নবাদের প্রবক্তা থিওডোর হারজালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক ইহুদী সম্মেলনে ইহুদী নেতৃবৃন্দ ২৪টি প্রটোকল তৈরি করে। ঐ সম্মেলনে ৫০টি ইহুদী সংগঠনের বিরাট সংখ্যক ইহুদী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক অংশ নেয়। তখন থেকে তারা প্রতিবছর ১ বার আন্তর্জাতিক ইহুদী সম্মেলন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যা আজ পর্যন্ত অব্যাহত আছে । ইহুদী প্রটোকলটি তাদের কাছে আধুনিক ইহুদী চিন্তাধারার উৎস বলে বিবেচিত হয়। তৃতীয় প্রটোকলে উল্লেখ করা হয়েছে, “আমাদের উদ্দেশ্যের পথে যে কোন অন্তরায়কে আমরা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবো। আমরা আম্বিয়ায়ে কেরামের শরীয়তে দেখতে পাই যে, আল্লাহ আমাদেরকে তার যমীনে শাসন করার জন্য বাছাই করেছেন এবং তিনি আমাদরেকে সেই যোগ্যতা ও প্রজ্ঞা দান করেছেন। আমরা যখন সক্ষম হবো, তখন গোটা বিশ্ব শাসন করবো এবং তখন আমাদের ধর্ম ছাড়া আর কোন ধর্মকে সহ্য করবো না।” তাওরাত ও তালমুদ অনুযায়ী হাইকাল তৈরির পর তারা জেরুজালেম থেকে গোটা বিশ্বকে শাসন করার জন্য একজন শাসকের অপেক্ষা করছে।

যায়নবাদ ও হাইকাল

ইহুদী প্রটোকল অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে কার্যকর আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তাকে আধুনিক যায়নবাদ আন্দোলন বলা হয়। এই আন্দোলনটি জেরুজালেম ও হাইকাল পুনঃনির্মাণ সম্পর্কে কর্মসূচী দিয়ে থাকে। যায়নবাদের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, এটি ইহুদীদের একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন।

ইহুদী বিশ্বকোষে 'যায়নবাদে'র ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ইহুদীরা নিজেদের ঐক্য প্রতিষ্ঠা, জেরুজালেমে আগমন, শত্রুদের উপর বিজয়, মসজিদে আকসার বদলে হাইকাল নির্মাণ এবং সেখানে উপাসনা করতে চায়।

ইতিমধ্যে ইহুদীরা যায়নবাদী আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্যসমূহের কয়েকটি অর্জন করতে সফল হয়েছে। তারা ফিলিস্তিনে ফিরে এসেছে ও সেখানে ইসরাইল নামক ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে এবং জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করেছে। এখন তারা তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ ইহুদী কিবলা বা ৩য় হাইকাল নির্মাণের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।

সেজন্য তাদের সামনে মুসলমানদের ১ম কিবলা মসজিদে আকসা ভাংগার অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু বাকী নেই।

প্রথম ইহুদী প্রধানমন্ত্রী বিন গুরিয়ন বলেছেন, 'আমরা সামিয়কভাবে তলোয়ার খাপবদ্ধ রেখেছি। আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা বিপন্ন হলে আমরা অবশ্যই তলোয়ার ধারণ করবো। ইহুদী জাতি নীলনদ থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত বিস্তৃত নিজ বাপ-দাদার ভূমিতে বসতি স্থাপন করবে।"

হাইকাল ও ফ্রি ম্যাসন আন্দোলন

ইংল্যান্ডের প্রাচ্যবিদ ডোজির মতে, ফ্রি ম্যাসন আন্দোলন বলতে বুঝায়, একটি বিশেষ লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য বিভিন্ন মত ও পথের বহু লোকের একসাথে কাজ করা। আর সেই কাজটি হচ্ছে, ইসরাইলের প্রতীক হাইকাল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। ইংরেজীতে Free Mason শব্দের অর্থ হল, স্বাধীন রাজমিস্ত্রী। অর্থাৎ তারা কথিত হাইকাল তৈরির জন্য স্বাধীন রাজমিস্ত্রী।

ফ্রি ম্যাসন আন্দোলনের শুরুতেই হাইকালে সুলাইমানী প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয় এবং ইহুদীবাদ বিরোধী যে কোন ধর্ম ও মতবাদকে উৎখাত করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা হয়। যাতে করে ইহুদীরা গোটা বিশ্বের নেতৃত্ব হাতে নিতে পারে। যায়নবাদের পরেই এই আন্দোলনের মর্যাদা হচ্ছে দ্বিতীয়। এগুলোর মাধ্যমে সম্প্রসারণবাদী ইহুদীরা নিজেদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে চায় ।

ফ্রি ম্যাসন আন্দোলন কাজের জন্য বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে থাকে। তারা রোটারী ক্লাব, লায়ন্স ক্লাব, বার্থ ম্যাসন, ইউনিয়ন এন্ড ডেভেলপমেন্ট, ইয়াহওয়া উইটনেস, বাহাই ইত্যাদি ছদ্মনামে নিজেদের কাজ করে থাকে ।

১৯৫৬ খৃঃ ফ্রান্সে তাদের এক আনুষ্ঠানিক ইশতেহারে বলা হয়, আমরা ম্যাসন, আমরা অন্যান্য ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ক্ষান্ত হতে পারি না। যুদ্ধে হয় আমরা জয়ী হবো, নয় তারা। হয় তারা মরবে, নচেত আমরা মরবো। সকল ইবাদতগাহ বন্ধের আগ পর্যন্ত আমরা আরাম পাবো না ।

প্রতীক্ষিত মাসীহর আগমন ও হাইকাল পুনঃ নির্মাণ

আমরা প্রথমে ইহুদীদের প্রতীক্ষিত মাসীহ সম্পর্কে আলোচনা করবো। ইহুদীদের প্রতীক্ষিত মাসীহর আগমনের সাথে মসজিদে আকসা ধ্বংস ও সেই স্থানে তৃতীয় হাইকাল তৈরির বিশ্বাস গভীরভাবে জড়িত। তাদের এই ধারণা প্রাচীন। উপযুক্ত সময়ে সেই মাসীহ আসবে। অর্থাৎ হাইকাল তৈরির পর পরিবেশ অনুকূল হলে বহু প্রতীক্ষিত মাসীহ আসবেন এবং তাঁর হাতে ইহুদীরা মুক্তি ও পরিত্রাণ পাবে। তাকে তাদের বাদশাহ হিসেবে রাজমুকুট পরানো হবে। তিনি জেরুজালেম তথা ৩য় হাইকাল থেকে গোটা দুনিয়া শাসন করবেন। এই মাসীহ সর্বপ্রথম দুনিয়ায় আসবেন। কিন্তু খৃস্টানদের মতে, হাইকাল পুনঃ নির্মিত হলে মাসীহ ঈসা বিন মরিয়াম দুনিয়ায় পুনরায় আসবেন এবং সেটা হবে তার ২য় আগমন। কিন্তু ইহুদীদের মাসীহ খৃস্টানদের মাসীহ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পুরুষ ।

ইসলামের দৃষ্টিতে, কেয়ামতের সামান্য আগে হযরত মাসীহ ঈসা (আঃ) পুনরায় দুনিয়ায় আসবেন। তিনি মরিয়মের সন্তান হিসেবে হযরত দাউদের বংশধর। তাওরাতও সেই কথা বলেছে। কেউ কেউ তাওরাতে বর্ণিত প্রতীক্ষিত মাসীহ বলতে হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নবুওতকে বুঝিয়েছেন! সে অনুযায়ী সেই মাসীহ এসে গেছেন এবং ইহুদীরা তাঁর নবুওতকে অস্বীকার করে সেই নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়েছে । যাই হোক, মুসলিম ও খৃস্টানদের বিশ্বাস মোতাবেক যে মাসীহ ঈসার আগমন ঘটবে, ইহুদীরা তা অস্বীকার করায় তাদের ভাগ্যে সেই বিরাট কল্যাণ ও সৌভাগ্য জুটবে না ।

তালমুদের মতে, তাদের প্রতীক্ষিত মাহদী আসার পর তিনি যখন বিজয়ী শাসক হিসেবে গোটা দুনিয়া শাসন করবেন তখন প্রতি ইহুদীর মাথাপিছু ২ হাজার ৩শ' দাস ভাগে পড়বে। মাসীহর আগমনের আগে যে যুদ্ধ সংঘটিত হবে, তাতে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ধ্বংস হয়ে যাবে।

ডঃ জোশেফ বারকলী তালমুদের উপর গবেষণার পর মন্তব্য করেছেন, ইহুদীদের কাছে প্রতীক্ষিত মাসীহর আগমন একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ৩১ ইহুদীদের প্রতীক্ষিত মাসীহর মর্যাদা লাভ করার জন্য বিভিন্ন সময় বহু ইহুদী নিজেকে মাসীহ বলে দাবী করেছে। ৬৪০ খৃঃ, ৭২০ খৃঃ, ৭৫০ খৃঃ, ১৬৪৮ খৃঃ এবং ১৬৬০ খৃঃ পৃথক ব্যক্তিরা মাসীহ হওয়ার দাবী করে। শেষ পর্যন্ত ইহুদী চিন্তাবিদরা যে প্রটোকল তৈরি করেছে, এর আলোকে তারা গোটা দুনিয়ার গোলযোগ, বিশৃংখলা, অশাস্তি ও যুদ্ধ-বিগ্রহ লাগিয়ে তাদের প্রতীক্ষিত মাসীহর আগমনের পরিবেশ সৃষ্টির অঙ্গীকার করেছে।

তাদের প্রটোকলের এক জায়গায় বলা হয়েছে, ইহুদীরা সেই মাসীহ ব্যতীত শান্তিতে বাস করতে পারবে না। চারদিক থেকে তাদের উপর অশান্তি নেমে আসবে। মাসীহ এসে তাদেরকে রক্ষা করবে। শেষ পর্যন্ত অন্যান্য লোকেরা মাসীহকে চরম স্বৈরাচারী বলেও অভিহিত করবে।

প্রতীক্ষিত মাসীহ সম্পর্কে খৃস্টানদের বিশ্বাস

বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়মে বিশ্বাসী খৃস্টানরা হাইকালকে পবিত্র মনে করে । তাদের দৃষ্টিতে খৃস্টবাদ হচ্ছে ইহুদীদেরই সম্প্রসারণ। তাই পুরাতন নিয়ম অর্থাৎ তাওরাত যেটাকে পবিত্র ঘোষণা করেছে, নতুন নিয়ম অর্থাৎ ইঞ্জিলের অনুসারীদেরও উচিত সেটাকে পবিত্র মনে করা। তারা আরো বিশ্বাস করে, হাইকাল পুনঃনির্মিত হলে, হযরত ঈসা মাসীহ (আঃ) ২য় বার দুনিয়ায় আসবেন। তাই হাইকাল তৈরির উদ্দেশ্যে তারা ইহুদীদের সাথে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত ।

তারাও মুসলমানদের মসজিদে আকসা এবং সাখবাকে ধ্বংস করে সে স্থানে হাইকাল নির্মিত হলে খুশি হয়। কেননা, তাদের ধারণা হচ্ছে, তখন ইহুদীরা খৃস্টধর্মে প্রবেশ করবে এবং সবাই খৃস্টান হয়ে যাবে। অথচ ইহুদীরা প্রথম থেকেই খৃস্টানদের জাতশত্রু। সে জন্য তারা ঈসাকে (আঃ) শূলবিদ্ধ করে মারার ষড়যন্ত্র করে। তাদের ধারণা এই যে, তারা ঈসাকে (আঃ) হত্যা করেছে। কিন্তু কুরআন বলছে, আল্লাহ ঈসাকে (আঃ) ঐ ষড়যন্ত্র থেকে উদ্ধার করেছেন এবং তাঁকে তারা হত্যা করতে পারেনি।

উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্থক্য হল, মসীহর আগমন ১ম না হয় তা নিয়ে। কিন্তু মাসীহর আগমনের ব্যাপারে তাদের মধ্যে কোন মতপার্থক্য নেই। যাই হোক, খৃস্টানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মাসীহর আগমনের আগে তিনটি বিষয় অবশ্যই ঘটবে। সেগুলো হচ্ছে- 
১. ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, 
২. জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী বানানো এবং 
৩. হাইকাল পুনঃনির্মাণ করা। এগুলো হওয়ার পর মাসীহ ঈসার আগমন ঘটবে।

একজন আমেরিকান লেখিকা বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ লক্ষ খৃস্টান প্রটেস্ট্যান্ট তাওরাতের বক্তব্যের আলোকে বিশ্বাস করে যে, দুনিয়ার সময় শেষ এবং মহাপ্রলয় নিকটবর্তী। এই প্রটেস্ট্যাদের নিজস্ব বেতার ও টেলিভিশন কেন্দ্র আছে এবং মার্কিন কংগ্রেসেও তাদের বহু সদস্য আছে। তারা এই বিশ্বাস অহরহ প্রচার করে বেড়াচ্ছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রের উন্নয়নে বিশ্বাসী। এমনকি তাদের দাবী আর্থিক সংকট থাকলেও বাজেটে পারমাণবিক কর্মসূচীর জন্য বিরাট বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। উদ্দেশ্য হল, এর মাধ্যমে মাসীহর আগমন সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা প্রমাণ করা অর্থাৎ উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হলে ঈসা মাসীহ আসবেন। এভাবে হারমাজদু দিবস উপস্থিত হবে ।৩২

ঐ খৃস্টানদের দৃষ্টিতে, একটি চূড়ান্ত যুদ্ধ আসন্ন এবং তা মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে ফিলিস্তিনেই সংঘটিত হবে। তাদের ও ইহুদীদের লক্ষ্য এক ও অভিন্ন। ঐ খৃস্টানদের কিছু সংস্থা মুসলমানদের মসজিদে আকসা ও সাখরা ধ্বংস করে সেখানে হাইকাল নির্মাণের উদ্দেশ্যে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে ।

মার্কিন মিশনারী ওয়েন বলেছেন, 'আমরা বিশ্বাস করি, ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং জেরুজালেমকে এর রাজধানী করার পর শুধুমাত্র হাইকাল পুনঃনির্মাণ বাকী আছে। এর ফলে, মাসীহ (আঃ) এর আগমন ঘটবে। ইহুদীরা খৃস্টানদের সহযোগিতায় মুসলমানদের মসজিদে আকসা ভেঙে সেখানে হাইকাল তৈরি করবে। কেননা, ইঞ্জিল এ কথাই বলে। ইহুদী সন্ত্রাসবাদীরা মুসলমানদের পবিত্র স্থানকে উড়িয়ে দেবে এবং ধর্মযুদ্ধে অংশ গ্রণের জন্য মুসলমানদেরকে উস্কানি দেবে। এর ফলে মাসীহ আসবেন এবং তাতে হস্তক্ষেপ করবেন। আমরা বিশ্বাস করি যে, তৃতীয় হাইকাল নির্মিত হওয়া উচিত।”

হারমাজদু বা মাজদু দিবসের প্রতি বিশ্বাস

খৃস্টান ও ইহুদীদের যৌথ বিশ্বাস হল, ভাল ও মন্দ শক্তির মধ্যে একদিন সংঘর্ষ অনিবার্য। সেই দিনের সংঘর্ষ হবে, ইতিহাসের সর্ববৃহৎ সংঘর্ষ। ঐ সংঘর্ষ ফিলিস্তিনে সংঘটিত হবে যা তেলআবিব থেকে ৫৫ মাইল দূরে, হাইফা থেকে ২০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে এবং ভূ-মধ্যসাগরের তীর থেকে ১৫ মাইল দূরে অবস্থিত। ইহুদী এবং খৃস্টানদের একটা অংশ আরো বিশ্বাস করে যে, ২শ' মিলিয়ন সৈন্য চূড়ান্ত লড়াইয়ে মাজদুতে হাজির হবে। মাজদুকে আরমাগেদ্দনও বলা হয়।

পবিত্র স্থান হাইকাল পুনঃনির্মাণ ও মাসীহর আগমন এবং মাজদু দিবসের ব্যাপারে ইঞ্জিলে বিশ্বাসী খৃস্টানদের ধারণা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে কখনও সঠিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এমন কি মাসীহর আগমন ছাড়া বিশ্বের কোথাও শান্তি কায়েম হতে পারে না। তিনি আসার পর জেরুজালেমে হযরত দাউদের আসনে বসবেন এবং ইসরাইলের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন। মূলতঃ ইহুদী ও খৃস্টানরা তাওরাতে বর্ণিত ঐ ঘটনার প্রতি বিশ্বাসী ।

তালমুদ হারমাজদু যুদ্ধের বিষয়ে বলেছে, চূড়ান্তভাবে ইহুদী শাসন প্রতিষ্ঠার আগে তাদের সাথে অন্যান্য জাতির যুদ্ধ হবে। যার ফলে, বিশ্বের এক- তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়ে যাবে। যুদ্ধে ইহুদীরা জয়ী হবে এবং জয়লাভ করার পর ৭ বছর ব্যাপী বিজিত অস্ত্রশস্ত্র জ্বালাবে। তখন বনি ইসরাইলের শত্রুদের দাঁত গজাবে এবং তা মুখ থেকে ২২ গজ পরিমাণ লম্বা হবে ।

প্রখ্যাত মার্কিন খৃস্টান পাদ্রী জিমি সুগার্ট, ১৯৮৫ খৃস্টাব্দের ২২ শে সেপ্টেম্বর, মাজদু দিবসের যুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এক টেলিভিশন ভাষণ দেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানও বিভিন্ন সময় একই মত প্রকাশ করেছেন। ১৯৮৫ সালে সান রিগো ম্যাগাজিন, ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যপ্রধান জেমস মিলসের এক প্রবন্ধ প্রকাশ করে। তাতে তিনি মাজদু দিবসের যুদ্ধ ও মাসীহর আগমন সম্পর্কে একই মতামত ব্যক্ত করেন ।

তথ্যসূত্র:
৩০. হায়াত বিন গুরিয়ন, ৩২ পৃঃ
৩১. আত্-তালমুদ, তারীখুহু ও তাআ'লীমুহু, পৃঃ ৫৯।
৩২. Prophecy & Politics by Grace Halsell, U.S.A. 
৩৩. Prophecy & Politics by Grace Halsell, U.S.A.


💖💝Thanks for being with Mohammadia Foundation. Pls Stay with us always💝💖

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

মোহাম্মদীয়া ফাউন্ডেশনের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url